হলি আর্টিজানে হামলায় সাতজনের ফাঁসি, বড় মিজান খালাস

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ হামলা চালায় জঙ্গিরা। রাতেই ১৭ জন বিদেশি নাগরিক, তিনজন বাংলাদেশি ও দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ওই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা উপলক্ষে আজ বুধবার সকালে আট আসামিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় এক আঙুল উঁচিয়ে ও হাসিমুখে প্রিজনভ্যান থেকে নামে নৃশংস হত্যার আসামিরা।

রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা মামলায় সাত আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া একজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার দুপুরে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। বিচারক আসামিদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ইস্যু করতে বলেছেন।

মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আসামিরা হলো জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, মো. আসলাম হোসেন র‍্যাশ, মো. হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মো. মো. আবদুস সবুর খান, মো. শরিফুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন। খালাস পাওয়া আসামি হলো মো. মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান।

এর আগে রায়কে কেন্দ্র করে আজ আদালতপাড়া কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ডেকে রাখা হয়। পুলিশ, র‍্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কয়েক স্তরে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা মামলার রায় উপলক্ষে আজ বুধবার সকালে আট আসামিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও আসামি মো. মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেন। রায় শোনার আগে হাসিমুখে এজলাসে যান বড় মিজান।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় সরকারপক্ষে শুনানি করেন গোলাম ছারওয়ার খান জাকির। আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন।

মামলার শুনানি শেষে গত ১৭ নভেম্বর মামলার রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করেন আদালত। গত বছরের ২৬ নভেম্বর মামলাটির বিচার শুরু হয়েছিল ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালে।

এর আগে গত বছরের ২৩ জুলাই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর গুলশান হামলা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে আটজন আসামি ঘটনার পর বিভিন্ন অভিযানে এবং পাঁচজন হলি আর্টিজানে অভিযানের সময় নিহত হয়। বাকি আট আসামির উপস্থিতিতে আজ রায় ঘোষণা করা হয়।

হলি আর্টিজান অভিযানে নিহত ৫ জঙ্গি

হলি আর্টিজানে হামলা-পরবর্তী অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়েছিল। তারা হলো রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।

বিভিন্ন অভিযানে নিহত ৮

হলি আর্টিজানর মামলার অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে বিভিন্ন ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানে নিহত আটজন হলো তামীম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

গুলশান হামলা নিহত হয়েছিলেন যাঁরা

হলি আর্টিজানে জঙ্গিরা গুলি করে ও গলা কেটে বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জনকে হত্যা করেন। তাঁরা হলেন ইতালীয় নাগরিক ফেডো ট্রেডিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিসেস ক্লাওদিয়া মারিয়া ডি এন্তোনা (৫৬), মিসেস সিমোনা মন্টি (৩৪), স্টুডিও টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিসেস নাদিয়া বেনেডেট্টি (৫১) ও সুপারভাইজার মার্কো টোনডাট (৪১), একটি টেক্সটাইল গ্রুপের মাননিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাপক মিসেস আদেলে পুগলিসি (৫৫), ক্রিশ্চিয়ান রসি (৪৭), একটি টেক্সটাইল কোম্পানির মালিক ক্লাদিও ক্যাপেলি (৪৫), মিসেস ভিনসেনজো ডি অ্যালেস্ট্রো (৪৫) ও মিসেস মারিয়া রিবোলি (৩৩)।

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা মামলার রায় উপলক্ষে আজ বুধবার সকালে আট আসামিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আঙুল উঁচিয়ে ও হাসিমুখে প্রিজনভ্যান থেকে নামে নৃশংস হত্যার আসামি রাকিবুল হাসান রিগ্যান। পরে তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত। ছবি : সাইফুল সুমন

নিহত জাপানি নাগরিকরা হলেন মেট্রোরেল প্রকল্পের সমীক্ষা কাজে নিয়োজিত হিরোশি তানাকা (৮০), কোয়ো ওগাসাওয়ারা (৫৭), ইয়োকি সাকাই (৪২), নোবুহিরো কোরুসাকি (৪৯), মাকোটো ওকামুরা (৩২), রুই সিমোডাইরা (২৯) ও হিডেকি হাশিমোটো (৬৫)।

ভারতীয় নাগরিক ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ছাত্রী তারিশি জৈন (১৮)।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ও আমেরিকার দ্বৈত নাগরিক রাজধানীর গুলশান ২-এর ৫০ নম্বর রোডের বাসিন্দা মো. এহসানুল কবিরের মেয়ে অবিন্তা কবির (২০) এবং ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেন (২০) নিহত হন।

অন্যদিকে ঘটনার শুরুতে জঙ্গিদের বোমার আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান ও ঢাকা মহানগর (উত্তরের) গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম।

অভিযানের সময় নিহত হন হলি আর্টিজান বেকারির দুই স্টাফ শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কুলকাঠি গ্রামের হাসেম চৌকিদারের ছেলে সাইফুল চৌকিদার (৪০) ও নারায়ণগঞ্জ সদর থানার একরামপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তার সরকারের ছেলে জাকির হোসেন শাওন (২২)।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। হামলার পর রাতেই তারা ২০ জনকে হত্যা করে। সেদিনই উদ্ধার অভিযানের সময় বন্দুকধারীদের বোমার আঘাতে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। পরের দিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হয় পাঁচ হামলাকারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেকজনের মৃত্যু হয়।

জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটির মুখপত্র ‘আমাক’ হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে বলে জানায় জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স’। যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ দাবি করে, নব্য জেএমবির সদস্যরা এই হামলা চালিয়েছে।

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা মামলার রায় উপলক্ষে আজ বুধবার সকালে আট আসামিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আঙুল উঁচিয়ে ও হাসিমুখে প্রিজনভ্যান থেকে নামে নৃশংস হত্যার আসামি মো. শরিফুল ইসলাম খালেদ। পরে তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত।

এ ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। মামলার পর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে দুই দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।

অন্যদিকে, এ মামলায় কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে আটক রাকিবুল হাসান রিগ্যানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিনি এ মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ হামলা চালায় জঙ্গিরা। রাতেই ১৭ জন বিদেশি নাগরিক, তিনজন বাংলাদেশি ও দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ওই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা উপলক্ষে আজ বুধবার সকালে আট আসামিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় এক আঙুল উঁচিয়ে ও হাসিমুখে প্রিজনভ্যান থেকে নামে নৃশংস হত্যার আসামিরা।